ছেলেবেলার কথা আমার প্রায়ই খুব মনে পড়ে। বিকেলে খেলতে যাওয়া, সন্ধ্যা নামতেই মায়ের বাড়ি ফেরার হাঁকডাক, কখনো পুতুল খেলায় মেতে ওঠা—সবটুকুই খুব উপভোগ করেছি।
তেমনই শীতকালের পিঠে–পুলির সময়টাও ছিলো খুব সুন্দর।
শীতকালে স্কুল থেকে ফিরতেই বিকেল হয়ে যেত। হেঁটে স্কুল ফেরার ক্লান্তিতে মুখটা গোমড়া হয়ে থাকত। বাড়ি এসে দেখতাম মা শীলনোড়ায় চাল বেটে গুঁড়ো তৈরি করছেন। আর সঙ্গে সঙ্গেই মনটা খুশিতে ভরে যেত।
মা বলতেন,
“তাড়াতাড়ি জামা খুলে হাত-পা ধুয়ে ভাত খেয়ে পড়তে বসো। আজ আর খেলতে যেয়ো না। স্কুলের পড়া তৈরি করে নাও। সন্ধ্যায় পিঠে হবে।”
একটু মন খারাপ হতো ঠিকই, কিন্তু সন্ধ্যার পিঠে খাওয়ার আনন্দে খেলতে না যাওয়ার দুঃখটাই ভুলে যেতাম।
মা আর ঠাকুমা মাটির রান্নাঘরে কাঠের উনুনে সন্ধ্যা থেকেই পিঠে বানানোর তোড়জোড় শুরু করে দিতেন। সাদা ধবধবে সাঁচের পিঠে, পুলি পিঠে, পাটিসাপটা, মালপোয়া, আর সঙ্গে নলেন গুড়ের পায়েস—আহা, কী সেই ঘ্রাণ!
জ্যাঠুমনি সকালে খেজুর গাছ থেকে রস পেড়ে আনতেন। ঠাকুমা নিজের হাতে সেই রস দিয়ে গুড় বানাতেন। ও-পাড়ার লোকজনও সেই গন্ধ পেতেন—যেমন স্বাদ, তেমনি ঘ্রাণ।
মা গরম গরম সাঁচের পিঠে প্লেটে সাজিয়ে দিতেন, সঙ্গে ছোটো একটি বাটিতে নলেন গুড়। আমি এক গাল হেসে খাওয়া শুরু করতাম। মা আলতো সুরে জিজ্ঞেস করতেন—
“ননী, কেমন হয়েছে?”
আমি মুখে পিঠে চিবোতে চিবোতে বলতাম—
“খুব সুন্দর মা।”
এখন সেসব কোথায়? সব যেন বদলে গেছে। ঠাকুমা নেই, জ্যাঠুমনিও নেই, নেই সেই খেজুর বাগানটাও। সত্যি, বড্ড মনে পড়ে সবকিছু।
ধীরে ধীরে বড়ো হলাম। নিজের একটি ছোট্ট সংসার হলো। পিঠে খেতে এখনও ভীষণ পছন্দ, তাই নিজের মতো করে বানানোর একটু চেষ্টা করি।
আজ এগুলো বানিয়েছি। ঠাকুমা থাকলে হয়তো ভীষণ খুশি হতেন। বড্ড মনে পড়ে তাঁকে।
ভালো থেকো, ঠাকুমা—যেখানেই থাকো।



