অলকানন্দা
অলকানন্দা

অলকানন্দা

দিন কয়েক আগে Spam-এ চোখ গেল। কত প্রেম Spam-এ পড়ে থাকে! ওয়ালে থাকুক না ভেবেছিলাম।
এমনটা যে হয়, সেটা শুনেছিলাম মাত্র।

প্রোফাইলটা যদিও নেই — অলকানন্দা,
কেমন আছো, জিজ্ঞেস করছি না। জানি ভালো আছো।
কিছু কথা আর বছরের পর বছর বুকে জড়িয়ে রাখতে পারছি না।
যতবার ভেবেছি বলবো, বুক কেঁপেছে, অস্থির হয়েছি।
বামন হয়ে চাঁদে হাত দেবো — তাতে চাঁদ যদি রেগে যায়, তখন তো অন্য কামড়ায় উঠবে, সেই ভয়ও ছিল।

অলকানন্দা, মনে আছে আমায়?
সেই দিন — ১২ই সেপ্টেম্বর, ২০১২।
সকাল ৭টা ২০-এ চাকদহ স্টেশন থেকে তুমি উঠলে।
তখন বয়স ২১ কি ২২ হবে — রোগা ছিপছিপে, কমলা রঙের চুড়িদার, সাদা ধবধবে ওড়না জড়ানো।
কোমর ছাড়ানো বেনুনি, কপালে ছোট্ট কালো টিপ, চোখে কাজল লেপা — কী মায়াবী, ফুলের মতো সুন্দর!

ট্রেনে উঠেই এদিক-ওদিক চোখ ঘুরিয়ে আমার রো-তে এসে দাঁড়ালে।
আমি তাড়াতাড়ি উঠে বসতে বললাম।
ঠোঁটের কোনে হালকা হাসি দিয়ে বললে, “না, ঠিক আছে, আপনি বসুন।”
সব বন্ধুরা কিন্তু বেশ কিছুদিন মজা করেছিলো।
বলা বাহুল্য, সেদিন ওখানে মধ্যমণি তুমি-ই ছিলে।

দেড় ঘণ্টা কীভাবে কেটে গেল, বুঝতেই পারিনি।
তারপর দু’মাস তুমি ঐ ট্রেনে, ঐ একই রো-তে উঠেছো।
বিধাননগরে নেমে তুমি হেঁটে চলে গেলে।
আমি তোমার পিছু দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাম।
কেন রইলাম, তখনো বুঝিনি।

এখন ভাবছো, অলকানন্দা কেন ডাকলাম?
তোমাকে দেখে এই নামটাই মনে ধরেছিলো।
সামনাসামনি বলতে পারিনি।
তুমি তথাকথিত ‘সুন্দরী’ নও,
তবু এত মায়া, এত কিছু এক মেয়ের মধ্যে কীভাবে থাকতে পারে — সেদিন থেকে ভাবা শুরু হয়েছিল।

আচ্ছা, এখনো কি সেই মাথা গুঁজে বই পড়ার অভ্যাস আছে?
সত্যি, ট্রেনে উঠেই বইয়ে মুখ গুঁজতে।
আর আমি তোমার দিকে তাকিয়ে থাকতাম,
দেড় ঘণ্টা যেন এক মিনিট মনে হতো —
সে খেয়াল কি ছিল তোমার?

মাঝে মাঝে অন্যকে জিজ্ঞেস করতে, “দাদা, কোথায় এলাম?”
কতবার যে চোখ সরিয়ে নিয়েছি, যদি তুমি খারাপ মনে করো!
তখন সদ্য চাকরি, রোগা গ্রামের ছেলে —
কখন যে তোমায় নিয়ে স্বপ্ন বুনতে শুরু করলাম, বুঝতেই পারিনি।

অলকানন্দা — এই নাম ধরে ডাকবো ভেবেছিলাম।
স্বপ্ন দেখতাম, আমার দোতলা বাড়িতে তুমি নূপুর পায়ে ঘুরবে,
তোমার লম্বা খোলা চুল আমার গা ঘেঁষে যাবে।
শীতের দুপুরে তোমার পায়ে আলতা পরিয়ে দেবো,
এক আলমারি বই কিনে দেবো — তুমি রোজ বই পড়ে আমায় শোনাবে।
স্বপ্ন দেখতাম, ভিক্টোরিয়ায় তোমার হাত ধরে ঘুরবো,
ময়দানে একসাথে হাঁটবো, মাসে একবার সিনেমা দেখবো।

দাওয়ায় বসে তোমার চুলে তেল মাখানো হলো না।
আচ্ছা, লম্বা চুলটা কেটে ফেলেছো, তাই না?
আমি থাকলে কিন্তু কখনো কাটতে দিতাম না।

অলকানন্দা, তোমার গলার পিছনের সেই কাটা দাগটা আছে?
নামার সময় চোখে পড়েছিলো — খুব ভয় পেয়েছিলাম।
তুমি বুঝতে পারোনি।
খুব ইচ্ছে করতো মলম দিতে দিতে বলি, “খুব ব্যথা, অলকা?”

অনেক পরে তোমার অফিসের ভাই পিন্টুর কাছে সব জানতে পারি।
ঘেন্না হয় পুরুষ জাতির ওপর —
এমন চাঁদের মতো মেয়ের ওপর এতকিছু কীভাবে করতে পারে!
আমি কিছুই করতে পারিনি তোমার জন্য।
আমার আরও সাহসী হওয়া দরকার ছিলো।

পিন্টু সেদিনও বলেছিল তোমার কথা।
তোমার নম্বর চাইতে পারিনি।
ফেসবুকে কত খুঁজেছি তোমায়।
২০১৭-তে অবশেষে পেয়েছিলাম,
কিন্তু তোমার প্রোফাইলে কিছু ছিল না, তাই কিছুই জানতে পারিনি।
আবার দেখলাম প্রোফাইল নেই।
কয়েকদিন আগে দেখলাম প্রোফাইল খোলা —
কতকাল পর তোমায় দেখলাম।

দু’মাস পর থেকে তুমি হঠাৎ ট্রেনে আসা বন্ধ করলে কেন?
আমি রোজ ৭টা ২০-তেই আসতাম।
একদিন না এলেই ভাবতাম, শরীর খারাপ নাকি।
তারপর আর এলেই না।
ফোন ছিল না তোমার, তাই যোগাযোগ করতে পারিনি।
পিন্টুকে কত জিজ্ঞেস করেছি — সে বলেছিল, কিছু জানে না।

সবকিছু এক নিমেষে এলোমেলো হয়ে গেল।
আমার যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি।
ম্যানেজারের গালাগালিও হেসে শুনতাম,
কারও কথা কানে ঢুকতো না।
তখন বুঝলাম — আমি তোমায় ভালোবেসেছি।

সুবীর দা’কে মনে আছে?
ওর সাথেও তোমার কথা বলতাম।
শেষে বুঝলাম, সেও তোমার প্রেমে পড়ে গেছে।
সুবীর দা বিয়ে করেনি — জিজ্ঞেস করলে বলতো, “মনে ধরেনি।”
চাকরি ছেড়ে এখন দোকান দিয়েছে শুনেছি।

আচ্ছা, তুমি কি এখনো এত চুপচাপ?
ট্রেনে তো মুখে কুটিটিও কাটতে না।

অলকা, আমার চুলে পাক ধরেছে — তোমার কি ধরেছে?
আমি কয়েক বছর আগে বিয়ে করেছি,
ওর নাম রেখেছি অলকা।
এই নামেই ডাকি।
বাদকুল্লার মেয়ে — ওকে দেখতে গিয়েই তোমার কথা জানিয়েছিলাম।
ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু ও যা বলেছিল, ভাবনার অতীত।
তোমাকে ও সম্মান করে — যেমন আমি করি।

তোমার অফিসের অনুষ্ঠানে তুমি কালো শাড়ি পরে এসেছিলে, মনে আছে?
প্রথম এবং শেষবার তোমায় শাড়িতে দেখেছিলাম।
আমি তো পাগল হয়ে গিয়েছিলাম দেখে — এখনো একা একা হাসি।
ওদের সাথে তোমার একটা ছবি পেয়েছিলাম —
আমাদের ডাইনিং টেবিলে ফ্রেম করে রেখেছি।
কেউ জিজ্ঞেস করলে অলকা বলে, “আমার না হওয়া সতীন 😄।”

বাবা কিন্তু সে বছর তোমার জন্য শাড়ি বানিয়ে রেখেছিল,
এখন অলকা সেটাই মাঝে মাঝে পরে।

তুমি পৃথিবীর সব সুখ পাও — এই কামনাই করি।
এতো বছরে আমার মন শান্ত হলো।
এক অস্থিরতায় ভুগেছি বহু বছর — আর পারছিলাম না।
ঝিনুককে ভালোবাসা দিও।

আমার মননে তুমি থাকবে —
আমার একতরফা, প্রথম প্রেম হয়ে।
যেগুলো হয়নি, সেগুলো নিয়ে এখন আর মন খারাপ করি না।
আমার সংসারের অলকা’কে নিয়ে ভালোবাসায় আছি।

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *